জ্বালানির অাকাশচুম্বী দাম ও যুদ্ধের চাপ

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ব্যাংকের ঋণঝুঁকি বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ব্যাংকগুলোয় ঋণঝুঁকি (ক্রেডিট রিস্ক) বাড়ছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল এ অঞ্চলের ব্যাংকগুলো সম্ভাব্য লোকসান মোকাবেলায় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি (লাভের অংশ ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রহ করা) সংরক্ষণ বাড়াচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে এ সঞ্চিতির পরিমাণ আরো বাড়াতে হতে পারে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স।

অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতের মতো দেশগুলোর ব্যাংক মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে সংস্থাগুলো এরই মধ্যে যুদ্ধের পরোক্ষ খরচের কারণে কয়েকশ কোটি ডলারের ক্রেডিট বা ঋণক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

ব্যাংকগুলো বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তার প্রভাব ব্যবসায় পড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো মূলত সম্ভাব্য খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাড়তি অর্থ সংরক্ষণ করছে। অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়লে ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকেই এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

ফরাসি বিনিয়োগ ব্যাংক ন্যাটিক্সিস সিআইবির প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ গ্যারি এনজি বলেন, ‘অনেক এশীয় ব্যাংক এরই মধ্যে ঝুঁকি মোকাবেলায় বাড়তি সংরক্ষণ শুরু করেছে। তবে এখনো বড় আকারে ঋণখেলাপির ঘটনা দেখা যায়নি।’

তার মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সহজে কমবে না। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতির কারণে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকতে পারে। এতে সুদহার কমানোর সুযোগও সীমিত হতে পারে। আর সুদের হার বেশি থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধক্ষমতা দুর্বল হয়।

যদিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো কভিড-১৯ মহামারীর সময়কার মতো গুরুতর নয়। পাঁচ বছর আগে মহামারীর সময় অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করেছিল, বর্তমান সঞ্চিতি তার তুলনায় অনেক কম।

রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার চারটি বড় ব্যাংক যুদ্ধসংশ্লিষ্ট ঝুঁকির জন্য মোট ৯৫ কোটি ৭০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সংরক্ষণ করেছে। এটি ২০২০ সালে গড়া সুরক্ষা তহবিলের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কম।

চীন ও জাপান বাদে এশিয়ার আটটি বড় ব্যাংক মোট ২৮০ কোটি ডলার সংরক্ষণ করেছে। এটিও মহামারীর সময়কার তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। যুদ্ধ এখন ১১তম সপ্তাহে গড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা থাকলে প্রকৃত ঋণ ক্ষতি বাড়তে পারে।

এরই মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব আঞ্চলিক অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, যা আগে উভয় বছরের জন্যই ৫ দশমিক ১ শতাংশ ধরা হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের উচ্চ দাম, মুদ্রার মান কমে যাওয়া এবং বন্ডের মুনাফা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোয় চাপ তৈরি হচ্ছে।

ইন্টারঅ্যাকটিভ ব্রোকার্সের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হোসে তোরেস বলেন, ‘চলতি প্রান্তিকে আঞ্চলিক ব্যাংক খাতের আয় আরো দুর্বল হতে পারে। কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।’

অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় ঋণদাতা ব্যাংক কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া (সিবিএ) সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতসংশ্লিষ্ট ঝুঁকির জন্য বাড়তি অর্থ সংরক্ষণের ঘোষণা দিয়েছে। এর পরদিনই ব্যাংকটির বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার কমে যায়।

গত দুই সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার আরো তিনটি বড় ব্যাংক সম্ভাব্য খেলাপি ঋণের ঝুঁকি মোকাবেলায় অতিরিক্ত ৭৫ কোটি ৭০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সংরক্ষণ করেছে।

বর্তমানে ব্যাংক খাতের জন্য বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে জ্বালানি বাজার। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল অনেক এশীয় অর্থনীতি এরই মধ্যে বাড়তি আমদানি ব্যয়ের চাপে রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। এতে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়ে।

বিশেষ করে, উৎপাদননির্ভর অর্থনীতিগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত হলে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হয়। এতে ব্যবসার আয় কমে যেতে পারে। ফল হিসেবে ব্যাংক ঋণ পরিশোধেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ঋণখেলাপির ঢেউ না এলেও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘ হলে করপোরেট খাতের আর্থিক চাপ বাড়বে। এতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তারা আরো বলেন, অনেক ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে বড় সংকটের আশঙ্কা কম। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও উচ্চ সুদহার একসঙ্গে থাকলে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় বিঘ্নিত হলে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি আরো বাড়বে। বিশেষ করে যেসব দেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, সেসব দেশের ব্যাংকগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে।

আরও